আজ বাজারে বেড়িয়ে এনার সাথে দেখা হলো। হাস্যমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দলের সাথে। বাজারের মধ্যে একজন আওয়াজ দিলো, কে vote দেবে CPIM কে?
দলের একজন বয়স্ক মহিলা যিনি একদম শেষে ছিলেন, তিনি ঘুরে উত্তর দিলেন, সবাই দেবে!
কিন্ত সত্যিই কি তাই?
সত্যিই তো কে vote দেবে? CPIM-কে কে দেবে জানিনা কিন্তু এই ছেলেকে কে ভোট দেবে? রাস্তা থেকেই শুনে এসেছি ইনি Presidency-র ছাত্র ছিলেন।
বাড়ী এসে এই কাগজ পড়ে দেখলাম ইনি গবেষণাও করেন।
আমি পড়েই ভাবলাম, হা কপাল! এতটুকুও সুযোগও উনি রাখেন নি, ভোটে জেতার।
Ph.D. research scholar কে কি কেউ ভোট দেয়? Ph.D. গায়ে মাখে না মাথায় দেয়, সেটাই আমজনতা জানে না।
গ্রাম তো ছাড়ো, শহরে এসে বাস করেও দেখা হয়ে গেলো যে শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মানুষেরাও মনে করে যারা পড়াশুনো করে তারা অন্য জগতের জীব। তারা সাধারণ মানুষের কষ্ট, জীবন যাত্রা কিছুই বোঝে না।
কিন্তু তাদের কে বোঝাবে যে সংবেদনশীল মানুষ পড়াশুনো জানলে তারা পৃথিবীকে নতুন আঙ্গিকে বুঝতে শেখে।
আসলে মানুষদের না বোঝার পিছনে তাদের নিজেদের জীবনযাত্রা প্রচুর প্রভাব ফেলে। যারা ভাবে, সমাজ ও পড়াশুনো পুরো আলাদা জগৎ, তারা সম্ভবত নিজেরা পড়াশুনো করার সময় বাজারে যাননি, ঘরের কাজ করেননি এবং পরবর্তীতে বাবা মা যদি হয়ে থাকেন, তাহলে নিজের ছেলেমেয়েকেও সেই ভাবেই বড় করেছেন যে তারাও "কুটোটি নেড়ে দুটোটি" করতে শেখে নি।
বহুদিন আগের একটা কথা বলছি । এখনও মনে আছে কথাটা, কারণ কানে খুব বেজেছিলো । মাধ্যমিক পরীক্ষাতে একটি মেয়ে প্রথম হয়েছিল, সাংবাদিকদের উত্তরে মেয়েটির মা বলেছিলো, "আমার মেয়েকে জলটা পর্যন্ত গড়িয়ে খেতে হয়না" বা এমন কিছু। মেয়েটি সম্ভবত ডাক্তার হয়েছেন এখন। আমার খুব জানার ইচ্ছে হয়, ডাক্তারি পড়ার সময় কে তাকে জল খাইয়ে দিতো?
প্রচুর মানুষের কাছেই পড়াশুনো করা এবং কাজ না শেখা প্রায় সমার্থক।
আমাদের বাড়ীর রান্নার দিদি তো প্রথমে খুব অবাক হয়েছিলেন এটা দেখে যে আমি পিঠে পায়েস রাঁধতে পারি আবার পড়াশুনোও করেছি।
আসলে Ph.D. কোনো ভিনগ্রহী কারবার নয়, এটা বোঝানোর চেষ্টা এই দেশে হয়না। বরং বোঝানো হয় যে এটা খুব মারত্মক একটা ব্যপার। অবশ্যই খুব পরিশ্রমের এবং নিষ্ঠার বিষয় । কিন্তু যে বিষয়, সেগুলো সমাজেরই বিষয়, মানুষেরই বিষয়।
আমার নিজের Ph.D. ছিলো Medical device এর coating এর উপর। সোজা বাংলায় বললে, চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত হয় এমন সব যন্ত্রপাতি বা প্রয়োজনীয় সামগ্রীর উপর আবরণ নিয়ে। মানুষের দেহের মধ্যে রক্ত থাকে । সেই রক্ত, দেহরস কোনো ধাতুর উপর জং ধরানোর জন্য একদম উপযুক্ত তরল। যদি কারোর দেহে কোনো প্রতিস্থাপন (যেমন হাঁটু) করতে হয়, তাহলে সব সময় এই চেষ্টা করতে হয় যে প্রতিস্থাপিত অংশটি যেন দীর্ঘ দিন স্থায়ী হয়। নইলে বারবার কিছু বছর অন্তর অন্তর প্রতিস্থাপন করতে হবে। এদিকে, জং ধরে ধাতু শরীরে মিশলে মৃত্যু পর্যন্ত হয়। জীবনকে মনোরম করার বদলে চিকিৎসা তখন উল্টে জীবনকে দুর্বিষহ করে দেয়।
আমার কাজ ছিলো বা এই রকম বিষয়ে প্রচুর গবেষকরাই ক্রমাগত কাজ করে যাচ্ছেন যাতে এই সব চিকিৎসা সামগ্রী অমরত্ব প্রাপ্ত হয়।
আমার মায়ের হাঁটুতে Zimmer Biomet এর অংশ লাগানো। এদিকে আমার গবেষণাও সম্ভব হয়েছে Zimmer Biomet এর অর্থ সাহায্যে।
বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। )
এটা বলার আমার একটাই উদ্দেশ্য যে গবেষণা কিন্তু ওতপ্রোত ভাবে আমাদের জীবনে জড়িয়ে।
এই যে মাথার উপর আপনার fan ঘুরছে, এটার পিছনে কতজনের শ্রম রয়েছে। যারা factory তে উৎপাদন করছেন, তারাও যেমন আছেন, তেমনি অনেক গবেষক আছেন যারা সব সময় চেষ্টা করছেন fan টাকে আরোও ভালো কি করে বানানো যায়। কেউ হয়তো fan এর motor এর উপর কাজ করছেন, কেউ হয়তো সেই পদার্থ টার উপর যা দিয়ে fan এর blade গুলো বানানো হয়। হয়তো এনারা কেউ কাউকে চেনেন না। কিন্তু এদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটা fan তৈরী হচ্ছে।
সেই fan তৈরীর শ্রমিকও যেমন সমাজের অংশ, ওই গবেষক ও। Fan টা খারাপ হলে আপনি দোকানে গিয়ে বলবেন। দোকানকার বলবে company - এর salesman কে। তিনি গিয়ে খবর দেবেন company তে। এই করে করে কিন্তু সেই গবেষকদের কাছেও পৌঁছাবে।
তার মানে হলো এই যে, সমাজ থেকে, জীবন থেকে, গবেষণা কিন্তু দূরের কোনো বিষয় নয়। আমি আরও অনেক উদাহরণ দিতে পারতাম। LPU তে চাকরী করার সময়, Botany, Social science এবং আরও অনেক বিষয়ে Ph.D. করা লোকজনের সাথে কথা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বিষয়ই কিন্তু সমাজের সঙ্গে যুক্ত। একজনের কাজ ছিলো ভ্রূণ হত্যা নিয়ে। এইবারও যদি আপনি ভাবেন Ph.D. সমাজ থেকে বাইরের কোনো বিষয়, আমার আপনাকে বোঝানোর আর কিছু নেই।
বিদেশে আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতাম সেখানে একটা দিন ছিলো "Open Day", সেইদিন বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী, শিক্ষক এবং অন্য আরোও অনেকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে গবেষণারত ছাত্র ছাত্রী দের সাথে কথা বলতো, জানতো তারা কি করে। আমরাও খুব সহজ ভাষাতে সেইগুলো বোঝানোর চেষ্টা করতাম। তাতে ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েরা খুব উৎসাহিত হতো।
আর একটা ছিলো, "3 minutes thesis competition", মানে ৩ minutes অপনাকে দেওয়া হবে, আপনার কাজটাকে বোঝানোর জন্য। এটা পুরো UK জুড়েই হতো। আমি দেশে ফিরে অনেককেই এই কথাটা বলেছি, তারা শুনে অবাক হয়েছে। ধুস, তাই হয় নাকি, ৩ minutes এ কি বলা সম্ভব?
না সম্ভব নয়, যদি আপনি mechanism বা graph বোঝাতে শুরু করেন। কিন্তু এই টাই তো কথা, কেউ আপনাকে সেগুলো বোঝাতে বলেনি। সহজ ভাষাতে জনগণের মন জয় করতে বলেছে।
পড়াশুনো কঠিন ছিলো, থাকবে। কিন্তু সহজ ভাষাতে পড়াশুনোকে সবার কাছে মনোগ্রাহী করে তুলতে হবে। এই দায়িত্ব কার?
আপনার। আপনি যিনি পড়াশুনো জানেন। যিনি এই কথার যথাযত উত্তর দিতে পারবেন, "পড়াশুনো করে কি হবে?"
সমাজ শিক্ষিত না হলে, এই শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা কোনোদিন vote এ জিতবে না। যাদের জ্ঞান নেই তাঁরা সমাজের মাথায় নাচবে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভুলভাল বক্তব্য রেখে দাঙ্গা বাঁধাবে। "Child abuse case" শুনে MP হয়েও হাসবে প্রকাশ্যে । (নিচের এই link টা দেখুন)
https://www.instagram.com/reel/DWWmuF9ko2l/?igsh=MWprdm12ZXN2aGFmdQ==
না আমি CPIM এর প্রচারে নামিনি। আমি এই ছেলেটিকে চিনিও না। কিন্তু আমি মনে করি, সমাজের ভালো করতে গেলে শিক্ষিত হওয়া এবং সংবেদনশীল হাওয়া খুব জরুরী।
সে তো Trump ও তো পড়াশুনা জানেন। কিন্তু তাতে তার বলতে বাঁধে না, যে উনি ওনার মেয়েকেই date করতেন যদি Ivanka ওনার মেয়ে না হতো। আর Epstein এর সাথে তার যোগাযোগ আর কুকীর্তি নিয়ে না হয় নাই বললাম। (আমি ভেবেছিলাম, Epstein file নিয়ে লিখব। কিন্তু বিষয়টা এতোটাই অন্ধকার বিভীষিকাময় যে ভালো করে পড়তেই পারলাম না, লিখবো কি?)
কাজেই শুধু পড়াশুনো নয়, একটা সুন্দর, সংবেদনশীল মন না থাকলে কিছুই হবে না।