তামিলনাড়ু, ভাঙড়, সোদপুর বা অতটা না আলোচিত নাদাবপাড়া। সর্বত্রই এক ঘটনা। অযৌক্তিক অসন্তোষ এবং তার উন্মত্ত বহিঃপ্রকাশ।
সোদপুরে একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে ট্রেনের ধাক্কায়, যেকোনো মৃত্যুই বেদনার এবং মৃতের পরিবারের প্রতি আমি সহানুভূতিশীল। কিন্তু কথাটা হচ্ছে এতে ট্রেনের কোনো দোষ ছিল না (ঘোষণায় ছিল ), ট্রেনের চালক রেল লাইন ধরেই ট্রেন চালাচ্ছিলেন। সালমান খানের গাড়ির মতো ট্রেন নিজের রাস্তা ছেড়ে ফুটপাথে উঠে আসেনি। অবশ্য এই দুর্ঘটনার পরবর্তীতে জনসাধারণের কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে, ট্রেন যদি সত্যিই এটটু কষ্ট করে 'সাইড' দিতো তাহলেই আর এই দুর্ঘটনা ঘটতো না। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ট্রেন নিজের ট্র্যাক ছাড়া চলতে পারেনা। আমরা সবাই জানি সেটা, জেনেও ব্যস্ত রেল লাইন পার করতে থাকি রোজ রোজ (আমি নিজে করিনা মোটেই, কিন্তু আমি তর্কের খাতিরে সেই জনতার মধ্যেই নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করলাম) শুধু মাত্র কিছু সময় বাঁচানোর জন্য। আর আমাদের সেই রেল লাইন ধরে যাতায়াতের জন্য লোকাল ট্রেনগুলো ধীরে চলে গন্তব্যে দেরীতে পৌঁছালে, সেই আমরাই আবার রেলদপ্তরের কর্মীদের আলস্যের সমালোচনায় মুখরিত হই।
আসলে আমাদের দাবিটা যে কি সেটা নিজেরাই ঠিক করে উঠতে পারিনি। পারবো বলেও মনে হয়না।
টাটার ন্যানো পশ্চিমবঙ্গ থেকে চলে গেছে। তাতে যে আমাদের রাজ্যের কিছু লাভ হয়েছে, এই ক'বছরে আমার তো সেটা মনে হয় নি। আমি ভেবেছিলাম বাকি সবারই একই মতামত। কিন্তু ভাঙড়ের ঘটনা আমায় সেই সিঙ্গুরের কথাই মনে করিয়ে দিলো। এখানে অবশ্য বিপুল পরিমান জমি দরকার হয়নি, তা সত্ত্বেও জনতার বিক্ষোভের আগুন সিঙ্গুরের থেকে কিছু কম বলে মনে হলো না। কিছু পেতে গেলে কিছু ছাড়তে হবে। সিঙ্গুরের ক্ষেত্রে এই কথাটা যদিও খাটে, এক্ষেত্রে তো লাভ ছাড়া লোকশান কিছু ছিল না। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার কয়েক লক্ষ মানুষ উপকৃত হতো যদি এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত করা যেত।
কলকাতা থেকে আমার বাড়ি যাওয়ার পথে দিগন্ত ব্যাপী চাষের জমি দেখা যায় আর দেখা যায় সেই জমিগুলোর উপর দাঁড়িয়ে থাকা আকাশ ছোঁয়া, অনেক অনেক ইলেকট্রিক ট্রান্সমিশন টাওয়ার। আবার সেই জমিতে সারাবছর ধরেই তাতে নানারকম ঢেউ খেলানো ফসলও দেখতে পাই।
যদিও আমি সীমিত জ্ঞানের অধিকারী, তা সত্ত্বেও আমার এই চাক্ষুশ অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়, অনেক উঁচু দিয়ে হাইটেনশন বিদ্যুতের লাইন গেলে, চাষবাসের বিশেষ কোনো ক্ষতি হয় না।
কিন্তু ভাঙড়ের মানুষকে কে বোঝাবে, যাদের বোঝানোর দরকার ছিল তারা ক্ষমতালোভী। সিংহাসন বড্ডো প্রিয় তাদের।ক্ষুদ্র স্বার্থের সামনে বৃহত্তর জনস্বার্থের মূল্য তাদের কাছে নেই। কাজেই যুক্তি দিয়ে বোঝানোর বদলে সান্তনা দিয়ে প্রশ্রয় দেওয়াই দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যে।
শুধু এ রাজ্য কেন, তামিলনাড়ুতেও তো সিংহাসনপ্রিয় শাসকদল উন্মত্ত জনতাকে নিরস্ত্র করার বদলে তাদের অযৌক্তিক দাবীকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। ঐতিহ্য এবং প্রথা এই দুটো শব্দের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য, এই সহজ বিষয়টা কেউ বুঝতে না পারলে শাসকের কর্তব্য সেটা বুঝিয়ে দেয়া।
কেরালাতে একটা প্রথা ছিল, নিচুজাতের নারীরা স্তন আচ্ছাদিত করে রাখতে পারবে না, যে রাখবে তাকে চড়া রাজকর দিতে হবে। এই প্রথাটাও তো অনেকদিন ধরে চালু ছিল। কিন্তু তাই বলে কি একে ঐতিহ্য বলা যায় ? এতো এক কলঙ্ক, সমাজের একদল মানুষের প্রতি তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষের বৈষম্যতার দলিল। ঠিক তেমনই জাল্লিকাটটু-ও পশুর প্রতি মানুষের অহেতুক অত্যাচারের প্রতিচ্ছবি। অহেতুক বললাম, কারণ উদরপূর্তির জন্য আমরা মাছ মাংস রোজ খায়, কিন্তু এক্ষেত্রে তিল তিল করে কষ্ট দেয়া হয় একটা ষাঁড়কে। ষাঁড়তো তাও মনুষ্যেতর প্রাণী, তার কষ্ট ছেড়েই দিলাম। কিন্তু কিছু মানুষও তো এই খেলায় অংশ নিয়ে মারা যায় এবং জখম হয় আরো বেশি। শুধু শুধু ঐতিহ্য বলে এমন প্রথাকে বাঁচিয়ে রাখা কি শুভবুদ্ধির পরিচয়?
কিন্তু 'শুভবুদ্ধি শুভবুদ্ধি' বলে আমি একা চেঁচিয়ে কি করবো? শুভবুদ্ধির কি সত্যিই কি কোনো মূল্য আছে? শুভবুদ্ধি তো শুধুই বিপদ ডেকে আনে। যেমন ডেকে এনেছে বিউটির জীবনে।
নাদাবপাড়া গ্রামের এই কিশোরী মেয়েটি বিয়েবাড়ি গেছিলো বৌ দেখতে। দেখেই তার মনে হয়েছে নববধূ নাবালিকা। সরকারি প্রচারের সৌজন্যে সে জানতো নাবালিকার বিয়ে দেয়া আইনত অপরাধ। সেই শুভবুদ্ধি কাজে লাগিয়ে প্রতিবাদ করতেই তার কপালে জুটেছে চড়-থাপ্পড় মার আর পুলিশের খাতায় নালিশ (সৌজন্যে: গ্রামের মোড়োল )। কারণ শুভবুদ্ধির থেকে শুভবিবাহ গুরুত্বপূর্ন, যতই সেটা বেআইনী হোক।
সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ।
পরিশেষে, একটা প্রশ্ন আমার বাঙালী পাঠকদের কাছে। বাঙালীরা তো নিজেদেরকে সংবেদনশীল বলে দাবী করে, তাই আশা করি অনেকেই এই জালিকাটটুর বিপক্ষে। কিন্তু কখনো দুর্গাপুজো নিয়ে এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হলে তারা কি করবেন?
দুর্গাপুজোর জন্য বারবনিতার প্রাঙ্গনের মাটি লাগে। হয়তো কোনোদিন এমন হলো যে বেশ্যাবৃত্তিটাই বিলুপ্ত হয়ে গেলো (অলীক কল্পনা যদিও, তবুও ধরলাম ) । বাঙালি তখন কি করবে ? উন্মত্ত আবেগে অন্ধ হয়ে, কাউকে বানাবে আম্রপালী ? ঐতিহ্য রক্ষা নাকি নারীর স্ব-ইচ্ছার মর্যাদা, কোনটাকে দেবে গুরুত্ব ?
সোদপুরে একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে ট্রেনের ধাক্কায়, যেকোনো মৃত্যুই বেদনার এবং মৃতের পরিবারের প্রতি আমি সহানুভূতিশীল। কিন্তু কথাটা হচ্ছে এতে ট্রেনের কোনো দোষ ছিল না (ঘোষণায় ছিল ), ট্রেনের চালক রেল লাইন ধরেই ট্রেন চালাচ্ছিলেন। সালমান খানের গাড়ির মতো ট্রেন নিজের রাস্তা ছেড়ে ফুটপাথে উঠে আসেনি। অবশ্য এই দুর্ঘটনার পরবর্তীতে জনসাধারণের কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে, ট্রেন যদি সত্যিই এটটু কষ্ট করে 'সাইড' দিতো তাহলেই আর এই দুর্ঘটনা ঘটতো না। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ট্রেন নিজের ট্র্যাক ছাড়া চলতে পারেনা। আমরা সবাই জানি সেটা, জেনেও ব্যস্ত রেল লাইন পার করতে থাকি রোজ রোজ (আমি নিজে করিনা মোটেই, কিন্তু আমি তর্কের খাতিরে সেই জনতার মধ্যেই নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করলাম) শুধু মাত্র কিছু সময় বাঁচানোর জন্য। আর আমাদের সেই রেল লাইন ধরে যাতায়াতের জন্য লোকাল ট্রেনগুলো ধীরে চলে গন্তব্যে দেরীতে পৌঁছালে, সেই আমরাই আবার রেলদপ্তরের কর্মীদের আলস্যের সমালোচনায় মুখরিত হই।
আসলে আমাদের দাবিটা যে কি সেটা নিজেরাই ঠিক করে উঠতে পারিনি। পারবো বলেও মনে হয়না।
টাটার ন্যানো পশ্চিমবঙ্গ থেকে চলে গেছে। তাতে যে আমাদের রাজ্যের কিছু লাভ হয়েছে, এই ক'বছরে আমার তো সেটা মনে হয় নি। আমি ভেবেছিলাম বাকি সবারই একই মতামত। কিন্তু ভাঙড়ের ঘটনা আমায় সেই সিঙ্গুরের কথাই মনে করিয়ে দিলো। এখানে অবশ্য বিপুল পরিমান জমি দরকার হয়নি, তা সত্ত্বেও জনতার বিক্ষোভের আগুন সিঙ্গুরের থেকে কিছু কম বলে মনে হলো না। কিছু পেতে গেলে কিছু ছাড়তে হবে। সিঙ্গুরের ক্ষেত্রে এই কথাটা যদিও খাটে, এক্ষেত্রে তো লাভ ছাড়া লোকশান কিছু ছিল না। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার কয়েক লক্ষ মানুষ উপকৃত হতো যদি এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত করা যেত।
কলকাতা থেকে আমার বাড়ি যাওয়ার পথে দিগন্ত ব্যাপী চাষের জমি দেখা যায় আর দেখা যায় সেই জমিগুলোর উপর দাঁড়িয়ে থাকা আকাশ ছোঁয়া, অনেক অনেক ইলেকট্রিক ট্রান্সমিশন টাওয়ার। আবার সেই জমিতে সারাবছর ধরেই তাতে নানারকম ঢেউ খেলানো ফসলও দেখতে পাই।
যদিও আমি সীমিত জ্ঞানের অধিকারী, তা সত্ত্বেও আমার এই চাক্ষুশ অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়, অনেক উঁচু দিয়ে হাইটেনশন বিদ্যুতের লাইন গেলে, চাষবাসের বিশেষ কোনো ক্ষতি হয় না।
কিন্তু ভাঙড়ের মানুষকে কে বোঝাবে, যাদের বোঝানোর দরকার ছিল তারা ক্ষমতালোভী। সিংহাসন বড্ডো প্রিয় তাদের।ক্ষুদ্র স্বার্থের সামনে বৃহত্তর জনস্বার্থের মূল্য তাদের কাছে নেই। কাজেই যুক্তি দিয়ে বোঝানোর বদলে সান্তনা দিয়ে প্রশ্রয় দেওয়াই দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যে।
শুধু এ রাজ্য কেন, তামিলনাড়ুতেও তো সিংহাসনপ্রিয় শাসকদল উন্মত্ত জনতাকে নিরস্ত্র করার বদলে তাদের অযৌক্তিক দাবীকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। ঐতিহ্য এবং প্রথা এই দুটো শব্দের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য, এই সহজ বিষয়টা কেউ বুঝতে না পারলে শাসকের কর্তব্য সেটা বুঝিয়ে দেয়া।
কেরালাতে একটা প্রথা ছিল, নিচুজাতের নারীরা স্তন আচ্ছাদিত করে রাখতে পারবে না, যে রাখবে তাকে চড়া রাজকর দিতে হবে। এই প্রথাটাও তো অনেকদিন ধরে চালু ছিল। কিন্তু তাই বলে কি একে ঐতিহ্য বলা যায় ? এতো এক কলঙ্ক, সমাজের একদল মানুষের প্রতি তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষের বৈষম্যতার দলিল। ঠিক তেমনই জাল্লিকাটটু-ও পশুর প্রতি মানুষের অহেতুক অত্যাচারের প্রতিচ্ছবি। অহেতুক বললাম, কারণ উদরপূর্তির জন্য আমরা মাছ মাংস রোজ খায়, কিন্তু এক্ষেত্রে তিল তিল করে কষ্ট দেয়া হয় একটা ষাঁড়কে। ষাঁড়তো তাও মনুষ্যেতর প্রাণী, তার কষ্ট ছেড়েই দিলাম। কিন্তু কিছু মানুষও তো এই খেলায় অংশ নিয়ে মারা যায় এবং জখম হয় আরো বেশি। শুধু শুধু ঐতিহ্য বলে এমন প্রথাকে বাঁচিয়ে রাখা কি শুভবুদ্ধির পরিচয়?
কিন্তু 'শুভবুদ্ধি শুভবুদ্ধি' বলে আমি একা চেঁচিয়ে কি করবো? শুভবুদ্ধির কি সত্যিই কি কোনো মূল্য আছে? শুভবুদ্ধি তো শুধুই বিপদ ডেকে আনে। যেমন ডেকে এনেছে বিউটির জীবনে।
নাদাবপাড়া গ্রামের এই কিশোরী মেয়েটি বিয়েবাড়ি গেছিলো বৌ দেখতে। দেখেই তার মনে হয়েছে নববধূ নাবালিকা। সরকারি প্রচারের সৌজন্যে সে জানতো নাবালিকার বিয়ে দেয়া আইনত অপরাধ। সেই শুভবুদ্ধি কাজে লাগিয়ে প্রতিবাদ করতেই তার কপালে জুটেছে চড়-থাপ্পড় মার আর পুলিশের খাতায় নালিশ (সৌজন্যে: গ্রামের মোড়োল )। কারণ শুভবুদ্ধির থেকে শুভবিবাহ গুরুত্বপূর্ন, যতই সেটা বেআইনী হোক।
সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ।
পরিশেষে, একটা প্রশ্ন আমার বাঙালী পাঠকদের কাছে। বাঙালীরা তো নিজেদেরকে সংবেদনশীল বলে দাবী করে, তাই আশা করি অনেকেই এই জালিকাটটুর বিপক্ষে। কিন্তু কখনো দুর্গাপুজো নিয়ে এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হলে তারা কি করবেন?
দুর্গাপুজোর জন্য বারবনিতার প্রাঙ্গনের মাটি লাগে। হয়তো কোনোদিন এমন হলো যে বেশ্যাবৃত্তিটাই বিলুপ্ত হয়ে গেলো (অলীক কল্পনা যদিও, তবুও ধরলাম ) । বাঙালি তখন কি করবে ? উন্মত্ত আবেগে অন্ধ হয়ে, কাউকে বানাবে আম্রপালী ? ঐতিহ্য রক্ষা নাকি নারীর স্ব-ইচ্ছার মর্যাদা, কোনটাকে দেবে গুরুত্ব ?
কৃতজ্ঞতাস্বীকার: আজকের লেখাটা আমার থেকে বেশী আমার বন্ধুর অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
তাই লেখার অনুপ্রেরণা - সৌরভ বিশ্বাসের ক্ষোভ। 😡
বিঃদ্রঃ সবাই নিশ্চয় বৈশালীর নগরনটী আম্রপালীর কথা পড়েছেন, গৌতম বুদ্ধ সংক্রান্ত রচনায়। কিন্তু যদি মনে না থাকে, তাই মনে করিয়ে দিই, আম্রপালী নিজ ইচ্ছায় নগরনটী হননি, রাজার আদেশ তাঁকে বাধ্য করেছিল। অতিসুন্দরী আম্রপালীর রূপে মুগ্ধ ছিল বণিক থেকে রাজপুত্র সকলেই। তাই রাজার আদেশে, তাঁকে সকলের হতে হয়।