Thursday, 10 April 2025

গণশত্রু

উদাহরণ ১. একটা গ্রামের মাঝে একটা ছোট্টো রাস্তা। মাঝখান দিয়ে দুটো কাঁচা নর্দমা। এক দম্পতি প্রথম সেখানে এসে দেখলেন, যাতায়াতের খুব অসুবিধা। তাদের নিজেদের মাইনেও অতি সামান্য, নিজেদের ঘর তৈরী করারই টাকা নেই। কিন্তু সেই অবস্থাতেও, তারা দুটো slab বসালেন নর্দমার উপর। 


এ সেই ৯০ দশকের ঘটনা। 


লোকজনের খুব সুবিধা হলো, কিন্তু সেই সুবিধার কথা কেউ জানাতে আসলো না।


আসলো কখন? যখন বর্ষাকালে গ্রামের মধ্যে জল থৈথৈ। সেই জল থৈথৈ আগেও হতো কিন্তু এবার তো দোষ দেওয়ার একটা অজুহাত তৈরী হয়েছে, "সেই slab দুটো এবং দম্পতি"। এমন সুযোগ কি কেউ ছাড়ে? কাজেই দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা দিয়ে যেতে আসতে, দম্পতিকে শুনতে হয়েছে, পাড়ার লোকের এই জলযন্ত্রণার জন্য তারাই দায়ী। কখনও ফিসফিসিয়ে, কখনো বা সরাসরি উচ্চকন্ঠে তাদের বিরুদ্ধে কথা উঠেছে, সেই সামান্য দুটো slab এর জন্য। 


তারপর সেই নর্দমা দিয়ে ৩৫ বছর ধরে অনেক জল বয়ে গেছে। এই ঘটনার অনেক পরে, হয়তো ২০/২৫ বছর পর, সরকারী উদ্যোগে পুরো নর্দমাটাই বাঁধানো হয়।


এখন আর রাস্তা আর slab আলাদা করে চেনা যায়না। এখন যারা ওখানে বাস করেন তারা জানেনও না কে বা কারা এটা করেছিলেন। কারণ, দম্পতি নিজেদের প্রচারের জন্য সেখানে নামফলক টাঙ্গিয়ে দেননি। আর এখন সেখানে তাঁরা থাকেনও না। আর থাকলেও যে প্রচার করতেন, তাও না। হয়তো বা ওনারা নিজেরাই ভুলে গেছেন। 




উদাহরণ ২. দম্পতির একজন চাকরী করতেন ব্যাঙ্কে। গ্রামের লোকজনদের সুপরামর্শ দিতেন, account খোলার জন্য। নিরক্ষর লোকজনকে সাহায্য করার জন্য নিজের হাতেই তাদের সব form fill up করে দিতেন। Recurring account এ টাকা জমা দিয়ে দিতেন। তাতে কতজনের কত সুবিধা হয়েছিলো। কেউ মেয়ের বিয়ের কানের দুল তৈরী করতে পেরেছিলেন, কেউ বা বাড়ী তৈরীর প্রথম ইট কিনতে পেরেছিলেন। কিন্তু, কিছু লোকজন এটাও প্রচার করতে শুরু করলেন যে এতে ওনার নিশ্চয় কোনো স্বার্থ আছে। অনেকে অনেক রকম কথা বললেন। সহজ বাংলায় বলতে গেলে, অনেকই যেটা ইঙ্গিত করলেন যে ব্যাঙ্ককর্মীটি দূর্নীতিগ্রস্থ। ওনার পরামর্শ মতো টাকা জমা করলে সেই টাকার আর হদিশ পাওয়া যাবে না।


তাতে কিন্তু সেই ব্যাঙ্ককর্মী নিরাশ হননি। মানুষকে সাহায্য করাও বন্ধ করেননি।


শেষ জীবন অবধি প্রাণপণে ভালোবেসে কাজ করেছেন।




উদাহরণ ৩. দম্পতির একজন ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি তার পরিবারের অজান্তেই প্রচুর মানুষকে সাহায্য করেছেন। এনার ভাগ্যতো সত্যিই খুউব খারাপ। যাদের জন্য করেছেন, তারাই উল্টে দুর্ব্যবহার করেছেন। এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি। 


তো সেই শিক্ষক প্রতিবছরই দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের বই দিতেন। সেই প্রত্যন্ত গ্রামে দুঃস্থ ছাত্রের সংখ্যা কমও ছিলোনা। তিনি কিন্তু কোনো সংস্থার মাধ্যমে ঢাক ঢোল পিটিয়ে, বই দিতেন না। কেউ আসলেই বলতেন, "ওই দোকান" থেকে নিয়ে নিতে। টাকা পরে উনি দিয়ে দিতেন। নিজের বাড়ির জন্য, পরিবারের জন্য ওনাকে loan কখনও নিতে হয়নি, কারণ ওনার অর্ধাঙ্গিনী ছিলেন ব্যাঙ্ক কর্মী, তিনিই loan সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু ইনি অন্যের জন্য loan নিয়েছিলেন। সেটাও হয়তো পরিবারে লোকজন জানতে পারতেন না, যদিনা আসল যার loan দরকার তিনি মাসে মাসে টাকা শোধ করা বন্ধ না করতেন, আর এই ভদ্রলোকের স্ত্রীর কাছে ব্যাঙ্ক ম্যানেজার সেই loan এর খোঁজ না নিতেন।


যায় হোক, এই গুলো সামান্য কিছু উদাহরণ। 


অনেকের জন্য অনেক কিছু করেও সারাজীবন বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই শুধু ভৎর্সনা শুনেছেন। অপমানিতও হয়েছেন।


কিন্তু হাতে গোনা গুটিকতক মানুষের কাছ থেকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ ও ভালোবাসা পেয়েছেন। হয়তো সেই টুকুই মনে রেখেছেন, সেই জন্য আজও নিজেদের পরিবর্তন করেননি। আজও যতটা পারেন, চেষ্টা করেন অন্যদের জন্য করার। 


কন্যাদ্বয়কেও সেই শিক্ষায় দিয়েছেন। তাই তারাও সেই দীক্ষায় দীক্ষিত। 


পিতা মাতা হিসাবে, সেই দম্পতি সব সময় বলেছেন, "কে কি বললো, সেটার থেকে বড়ো কথা, যেটা তোমার কর্তব্য সেটা করো। আর নিজের কাজে ১০০% দাও, অন্তত চেষ্টা করো। "


কন্যাদ্বয় রক্ত মাংসের মানুষ, তার উপর এখনো তাদের মা বাবার মতো অভিজ্ঞ নয়। তাই, এখনো হয়তো কিছু ক্ষেত্রে, প্রভাবিত হয়ে পড়ে কখনও সখনও। কিন্তু বেশিক্ষণের জন্য তো নয়ই। 


গ্রামের মানুষের তীক্ষ্ম দৃষ্টির মধ্যে বড়ো হওয়া দুই বোন, ছোটো থেকে এটা জানে, দৃষ্টির অস্বস্তিকে উপেক্ষা করে কি করে বাঁচতে হয় আর নিজের কাজটা কি করে করতে হয়।


গণশত্রু দেখে তো নিশ্চয়, তার থেকেও নিজেদের চোখের সামনে মা বাবাকে দেখে তারা অন্তর থেকে জানে, কাজ করলেই বরং দোষের ভাগীদার হতে হয়।


সেই জন্য এই মন্ত্রেই তারা বিশ্বাসী যে - "যদি কিছু করো সেটা নিজের মানসিক শান্তির জন্য করো, অন্যের কাছ থেকে জয়ধ্বনি পাওয়ার জন্য নয়।"


পড়া এবং পড়ানোর পাঁচকাহন।

  ছাত্র ছাত্রীদের "Electrostatics & Magnetostatics" পড়ানোর জন্য এই বইগুলো নিয়ে বসেছিলাম। একেই বলে জাহির করা। 🤭 "দেখো M...