Wednesday, 19 October 2016

নারীজীবনের স্বার্থকতা

আমি যে পাড়ায় থাকি, আমাদের পাশের পড়াটায় মূলত শ্রমজীবী মানুষেরা থাকেন, শ্রমজীবী মানে পুরুষেরা সাধারণত রিক্সা চালান, দোকানে কাজ করেন, আর মহিলারা অন্যের বাড়ি কাজ করেন। এখন অবশ্য সরকারের '১০০ দিনের কাজ' প্রকল্পের দৌলতে, নারী পুরুষ নির্বিশেষে মাটি কাটার কাজ করেন, হাতে অনেক টাকা পান (তুলনামূলক ভাবে), তাই বাকি ২৬৫ দিন ঘরে বসে কাটাতে বেশি ভালোবাসেন। ২৬৫-ও না, ৩০০ দিন ও হতে পারে, কারণ কানাঘুষো শুনি, হাতে কলমে কাজ না করেও কিছু টাকা পাওয়া যায়, কারণ খাতায় কলমে '১০০ দিন' দেখালে দুইপক্ষেরই লাভ। আমি যদিও '১০০ দিনের কাজ' ও তার ব্যর্থতা কিংবা রাজনৈতিক তরজা নিয়ে লিখতে চাইছিনা। আরে বাবা, এখনকার দিনে সবার হৃদয় খুব কোমল, কার ভাবাবেগে কখন আঘাত পড়ে, তার পর সে'ই না আমায় আঘাত করে, এই নিয়ে আমি খুবই সন্ত্রস্ত। কাজেই সরাসরি যে কথাটা বলতে চাইছিলাম সেটাতেই ফিরে আসি।
তো সেই 'দিন আনি দিন খায়' পাড়ায় দুটো কথা খুব প্রচলিত ছিল, এক- ওর আবার বাচ্চা হবে, দুই- মেয়েটার বিয়ে দিতে হবে। যেহেতু গরিব কাজেই ওদের মেয়ের বিয়েতে আশে পাশের পাড়ার মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবসময়-ই সাহায্য করতো কিন্তু আড়ালে আবডালে কিংবা ওদের মুখের উপরই বলে দিতো, 'বিয়ে কেন দিচ্ছিস? কদিন পরই তো বাচ্চা কাঁখে ফিরে আসবে?'
হ্যা, তুই করেই বলতো বেশিরভাগ লোক, কারণ আপনি যদি অন্যের থেকে বেশি টাকার মালিক হন, আমাদের সমাজ ব্যবস্থাই আপনাকে অধিকার দেয় অন্যদেরকে তুই-তুকারি করার। তবে কথাটা মন্দ বলতো না কেউই, ওদের পাড়ায় মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়া মানে মাত্র ১বছরের অপেক্ষা মেয়ের ফিরে আসার। কখনো কখনো ২-৩ মাসের মধ্যেও ফিরে আসতো। কিন্তু সদ্য সদ্য বিয়ে হওয়ার কারণে সেই জামাই হয়তো কখনো সখনো নিজের তাগিদেই বৌকে ফিরিয়ে নিয়ে যেত। অথবা, মা বাবাও কখনো আলোচনা করে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতো। কিন্তু সময় একটু পেরিয়ে গেলে, যখন মেয়েটাও আবার সদ্য হওয়া বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে লোকের বাড়ি কাজে লেগে  পড়তো,ব্যাপারটা অনেকটা গা সওয়া হয়ে যেত।
একটা সময়,  আমি আর দিদি বোধহয় হিসাব করে দেখেছিলাম, যে ওই পাড়ায় একটা মেয়েও নেই যে বিয়ের পর ফিরে আসেনি।

এখন কথাটা হচ্ছে ওরা ফিরে আসতো কেন? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েগুলো রজঃস্বলা হতে না হতেই বিয়ে দিয়ে দেয়া হতো, বরগুলো বয়সে বড় না হলেও, কাজ করতে শুরু করা মানেই মদ খাওয়া শুরু আর মদ খাওয়া মানেই রাতে কাজ থেকে ফিরে এসে বৌকে ধরে পেটানো। তার উপর শাশুড়িগুলোও যদি রূপকথার গল্পের সৎমায়ের মতো হয়, তাহলে তো কথাই নেই। 'গার্হস্থ্য উৎপীড়ন' মাত্রাছাড়া, সেটা সহ্য করা ওই টুকু মেয়ের পক্ষে সম্ভব হতো না, অগত্যা ফুলশয্যার মোহ কেটে যেতেই পিত্রালয়ে প্রর্তাবর্তন কয়েক মাসের মধ্যেই। 

এই ফিরে আসাটা এতোটাই স্বাভাবিক ছিল যে ওদের মধ্যে এটা নিয়ে কেউ কিছু বলতো না। কিন্তু ওই মধ্যবিত্ত ঘরের লোকজন সময় সুযোগ পেলে বাড়িতে কাজ করতে আসা বৌদি, কিংবা মাসীদেরকে কথা না শুনিয়ে ছাড়তো না। কারণ, মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে বিয়ের পর স্বামীর ঘর করতে না পারলে পরিবারের মাথা কাটা যায়। 

মধ্যবিত্ত সমাজে লোকলজ্জার ভয় প্রচুর, ছোট থেকে আমাদের শেখানো হয়, মেয়েদেরকে তো মানিয়ে গুছিয়েই চলতে হয়। সেই মানিয়ে গুছিয়ে চলাটা যে কতটা অবধি মানানো সেটা বলা বেশ কঠিন। কোনো ক্ষেত্রে হয়তো বরের ধমকি, কোনো ক্ষেত্রে হয়তো সারা গায়ে কালশিটে। আর সেই ঘটনাগুলো কিন্তু পরিবারের সবাই জানেন। এগুলো হলো 'ওপেন সিক্রেট', সবাই জানে কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে মানা।
এই কদিন ধরে যত যত গৃহবধূ হত্যার খবর আমরা পড়লাম, প্রত্যেকটাতেই মেয়েগুলোর বাপের বাড়ির লোক কিন্তু বলেছে, আমরা জানতাম জামাই এরকম, পণের জন্য অত্যাচার করতো, কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে' প্রত্যেক পরিবারই ভেবেছিলো 'সব ঠিক হয়ে যাবে'। এই অজ্ঞাত কারণটা যে কি এবং কি ঠিক হয়ে যাবে সেইটা সেই ছোটবেলা থেকে আজও আমি বুঝে উঠতে পারলাম না।

মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর পরই কাকিমা জেঠিমারা নিজেদের জামাইয়ের প্রশংসায় পাগল হয়ে যেতেন, এমন জামাই নাকি হয় না। তারপর ধীরে ধীরে কানাঘুষো শোনা যেত, জামাইয়ের এই দোষ ওই দোষ। কিন্তু পুজো বা পারিবারিক অনুষ্ঠান ছাড়া মেয়ে বাপের বাড়ি আসতো না। এবং সেটি তার শ্বশুরবাড়ি ভালো হওয়ার নমুনা, 'NOT' সেই মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েটার সাফল্য।
আর ভুল ক্রমে কেউ যদি ফিরে আসতো, তাতে শ্বশুরবাড়ির বিশেষ দোষ হতো না, কিন্তু মেয়েটির মানিয়ে না নিতে পারার  অক্ষমতার প্রচুর সমালোচনা হতো।

এখন অবশ্য সেই 'দিন আনি দিন খায়' পাড়াতেও আমাদের মতো পাড়ার ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামগুলোর সার্বিক উন্নতির দৌলতে তাদেরও পাকা ঘর হয়েছে, যে দুটো প্রচলিত কথা ছিল, সে দুটোই আজ পুরোনো হয়েছে, সরকরি প্রচার এবং 'আশা' স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রচেষ্টায় মুহুর্মুহ বাচ্চা হওয়াটা বন্ধ হয়েছে, সাথে সাথে বিয়ের পর মেয়ের বাপের বাড়ি ফিরে আসার চলও কমেছে, হাতে টাকা এসে বোধহয় চক্ষুলজ্জা বেড়ে গেছে সকলের। 

কিন্তু ঘরের ভিতরের 'ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স' কি কমেছে, আশে পাশের কারণসুধা বিক্রির বহর দেখে তো তা মনে হয়না। 
তাই মনে প্রশ্ন জাগে, নারীজীবনের স্বার্থকতা কোনটাতে বেশি, কালশিটে গায়ে শ্বশুরবাড়ির হেঁসেল ঠেলা নাকি নবজাতককে কোলে নিয়ে অন্যের বাড়ি কাজ করে নিজের খরচ নিজেই জোগাড় করা?

আরো একটা কথা মনে পরে গেলো, সেটা দিয়েই আজকের লেখাটা শেষ করি। 
ওই পাড়াতে একটা বৌকেই মরতে দেখেছিলাম আগুনে পুড়ে, সরাসরি নয়, ঘরটা পুড়তে দেখেছিলাম। শুনেছিলাম সে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টায় ছিল। 


বিঃ দ্রঃ কারো কারো জামাই সত্যিই খুব ভালো হন, দয়া করে সেই জামাইদের শ্বাশুড়িরা আমায় গাল পাড়বেন না। আমি তো জানিই পৃথিবীতে ব্যতিক্রম আছেই, বৌমারাও দজ্জাল হন আর বৃদ্ধ পিতা মাতাদের প্রতি সন্তানদের অবহেলা সংক্রান্ত লেখা লিখেই আমার ব্লগটার সূচনা করেছিলাম। 

2 comments:

পড়া এবং পড়ানোর পাঁচকাহন।

  ছাত্র ছাত্রীদের "Electrostatics & Magnetostatics" পড়ানোর জন্য এই বইগুলো নিয়ে বসেছিলাম। একেই বলে জাহির করা। 🤭 "দেখো M...