Wednesday, 11 May 2016

মায়ের প্রতি

কদিন আগে মাতৃদিবস গেল, সবাই ফেইসবুকে দিনটা উজ্জ্বাপনও করলো। আমি কিছুই করলাম না, কারণ আমি মায়ের জন্য সত্যিই কিছুই করতে পারি না। অনেক মজার পোস্ট দেখলাম; যেমন, মাতৃদিবস এমন এক দিন যেদিন তুমি তার সাথে সেল্ফি তুলে পোস্ট কর যাকে তুমি ফেইসবুক-এ ব্লক করে রেখেছো।
খুব হাসি পেল, কারণ মাতৃদিবসে আমি যদি সবচেয়ে বেশিবার কারো প্রোফাইল চেক করে থাকি সেটা আমার মায়ের। সেদিন রবীন্দ্রজয়ন্তী ছিল, আমার মা আজ সাতাশ বছর ধরে এই অনুষ্ঠান করে যাচ্ছেন, কাজেই সারাদিনই এই উত্তেজনা ছিল, মায়ের অনুষ্ঠান কেমন হলো, সব ঠিকঠাক ভাবে হলো তো, যেহেতু মা ব্যস্ত, তাই কল করতে পারছি না, অগত্যা ফেইসবুক এ ভরসা অনুষ্ঠান-এর হাল হকিকত জানার জন্য।
আমার মাকে, মা হিসাবে পেয়ে (এবং আমার বাবাকে বাবা হিসাবে, আর আমার দিদির মত দিদি পেয়ে) আমি কতটা ভাগ্যবতী সেসব বলার জন্য আজ আমি এসব লিখছি না।
কিন্তু আমি ঋদ্ধ এবং গর্বিত এটা ভেবে যে, যেখানে সাধারণত মায়েরা ছেলে মেয়ের পিছু নেয় মানে নজর রাখে, এটা জানার জন্য যে তাদের জীবনে কি চলছে আর আমি সেখানে আমার মাকে নিয়ে কৌতুহলী হচ্ছি সেই মাতৃদিবসেই।
সত্যিই, প্রকৃত অর্থেই ৮ ই মে, আমার মায়ের দিন ই ছিল। শুধু আমার মা নন, কাকিমা, মাসিমা, দিদি, বৌদি সবারই দিন ছিল, যারা মঞ্চে উঠে অত লোকের মাঝে সমাপ্তি নাটকে অভিনয় করেছেন। আমার মা হয়ত অনুপ্রাণিত করেছেন গৃহবধূর খোলস থেকে বেরিয়ে এসে সঙ্কোচ ঘুচিয়ে সবার সামনে নিজেকে প্রমান করার জন্য। কিন্তু জীবনের এত গুলো বছর শুধু বাড়ির বউ হয়ে, শুধু মাত্র মা হয়ে কাটিয়ে দিয়ে আজ একজনের কথায় অভিনেতা হয়ে ওঠা খুব সহজ কথা নয়, তার জন্য দরকার ঐকান্তিক ইচ্ছা আর মনের জোর। সেই জোর যে তারা আনতে পেরেছেন তার জন্য আমি সবাই কে অভিনন্দন জানাই।
সত্যি কথা বলতে মনের জোর মায়েদের সব সময় ই ছিল, সেই জোরের জন্যই তো শত বাধা বিপদ মাথায় নিয়েও মায়েরা সন্তানকে সুরক্ষিতরাখতে পারেন, সেই কারণেই আমরা একটা খোলা আকাশ পাই, নির্দ্বিধায় ছুটে বেড়াতে পারি নিজেদের জগতে। আর আমরা ছুটতে ছুটতে কখন যে মায়েদেরকে পিছনে ফেলে আসি তা বুঝতেই পারি না। তখন সেই মায়েরা হয়ে পরেন একা, অনেকে অবসাদে ভোগেন। তাই আমরা সন্তানরা যদি, মায়ের জন্য সময় দিতে না পারি, অন্তত এটা তো বলতে পারি, মা তুমি সব পারো, তুমিই তো আমায় এই সব শিখিয়েছ, আর আজ নিজের জন্য সেই মনের জোর ফিরিয়ে আনতে পারবেনা!
মাকে তো সবাই ভালবাসে, মাকে ছাড়া কারো চলে না, এই সব কথা ফেইসবুক এ লিখে দুনিয়াকে জানানোর সাথে সাথে যদি মার পাশে একটু বসে, বলি, মা অনেক তো বাঁচলে সবার জন্য, একটু নিজের জন্যও বাঁচো। আর মাকে যদি মায়ের সেই নিজের দুনিয়ায় নিয়ে যেতে একটু সাহায্য করি, তাহলেই বোধহয় যথার্থ ভাবে মাতৃদিবস পালন করা হবে।
আমার ক্ষেত্রে যদিও এ কথা প্রযোজ্য নয়, আসলে আমাদের মা-ই আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে, হয়ত তার নাগাল পেতে পেতে মায়ের বয়সে পৌছে যাবো, তাও নাগাল পাব না। smile emoticon
মেয়েদের বয়স বলতে নেই, আমার মায়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এই যুক্তি খাটে না, কারণ উনি সরকারী কর্মচারী, আর কদিন পরেই অবসর নেবেন। এই বয়সে, নানা রকম শারীরিক অসুস্থতা সামলেও কর্মক্ষেত্রে এবং সাংস্কৃতিক জগতে এত উজ্জ্বল ভাবে উপস্থিত, মায়ের হাটুর বয়সী লোকেরও এত কিছু সামলাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে।
সকালে প্রভাত ফেরি, তারপর সন্ধ্যায় একার হাতে একটা ৪ ঘন্টার অনুষ্ঠান সফল ভাবে চালানো, অডিটোরিয়াম ভর্তি শ-পাঁচেক লোককে বসিয়ে রাখা শুধু রবীন্দ্রনাথকে ভরসা করে, সেটা আজকের অপসংস্কৃতি-র যুগে এক বিরল কৃতিত্ব। এবং কোনো রকম প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই শুধু নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটা নাটক পরিচালনা করা (যেখানে পোশাক থেকে চিত্রনাট্য পুরোটাই নিজের ভাবনার ফসল) বাহবার যোগ্য।
পরিশেষে বলি, মা, আমার পরম আদরের মা, কোনো কাজ করলে যতই প্রসংশিত হোক, নিজ মনেই হয়ত দ্বিধাদ্বন্দ থাকে, সেটা থাকায় তো ভালো, আরো ভালো কিছু করার তৃষ্ণা, কিন্তু তুমিই তো আমাদের শিখিয়েছ, জীবনে খুশি থাকতে গেলে সীমারেখা টানা দরকার। এই যে বিগত ৬ মাস ধরে এত পরিশ্রম করলে, তাই একটু আরাম তো তোমার প্রাপ্য। তাই ব্যর্থতা বা দুশ্চিন্তা থেকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্ত হয়ে সাফল্য উপভোগ কর।
আর তুমি মানো না মানো সত্যিই কিন্তু তুমি সফল, হোক না ছোট গ্রাম, সেই ছোট গ্রামের প্রতিটা লোক তোমার অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বলছে, সেটা কি কম সাফল্য? তোমার বড় মেয়ে তোমার জন্য নিঁখুত ভাবে তোমার বাড়ি ঘর গুছিয়ে রাখছে, তোমার ছোট মেয়ে প্রায় ২ ঘন্টার চেষ্টায় বাংলায় টাইপ করে একটা রচনা লিখে ফেলছে তোমাকে নিয়ে tongue emoticon , তোমার স্বামী সব সময় তোমার পাশে থাকছেন , তুমি অফিস না গেলে তোমার কলিগরা তোমায় মিস্ করছে, সে তো মা, স্ত্রী, কর্মী সমস্ত রূপেই তুমি সফল বলেই তো!
মাতৃদিবসে তো বলা হয়নি, তাই আজ বলি, শুধু মা বলে নয়, নারী বলে নয়, একজন পরিশ্রমী, স্বপ্নচারী মানুষ হিসাবে তুমি আমাদের অনুপ্রেরণা।তোমায় প্রনাম।

No comments:

Post a Comment

পড়া এবং পড়ানোর পাঁচকাহন।

  ছাত্র ছাত্রীদের "Electrostatics & Magnetostatics" পড়ানোর জন্য এই বইগুলো নিয়ে বসেছিলাম। একেই বলে জাহির করা। 🤭 "দেখো M...