মাতৃদিবসে
মায়ের কথা বললাম আর
পিতৃদিবসে বাবার কথা যদি না
বলি তাহলে একটু পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে
যাব না? এমনিতেই সমস্ত
পরিচিতজনের কাছে মায়ের সম্পর্কে
একটু বেশী বলি বলে
বদনাম আছে, কিন্তু আজকের
দিনে শুধু বাবার কথায়
হোক।
আসলে
আমার বাবাকে এক কথায় প্রকাশ
করা একটু মুশকিল, কিছুক্ষেত্রে
অত্যন্ত দৃঢ়, কিছু সময় মাটির
মানুষ। আমাদের দুই বোনের সাথে
বাবার সমীকরণ দুই রকম। তাই
আমি যেভাবে বাবাকে জানি, দিদি হয়ত সম্পূর্ণ
অন্য আঙ্গিকে বাবাকে জানে। দিদি হয়ত জানে
না, বাবা এখনো দিদিকে
ছেলেমানুষ ভাবেন, আমাকে কি ভাবেন তা
অবশ্য আমি জানি না,
তবে ছোটবেলায় বাবা আমাকে মা
বলে ডাকতেন।
আমাদের ছোটবেলায় মা নিজেকে এমন
রাগী ভাবে উপস্থাপন করতেন
যে মাকে আমরা দুইবোন ভীষণ
ভয় পেতাম, পড়াশুনো, জীবনযাপন সবকিছুই আমরা অনেক নিয়ম মেনে
করতাম, আর সেইখানে বাবা
ছিলেন, অনেকটা মুক্ত আকাশ। পরীক্ষার আগের রাতে ৮
টা না বাজতেই বলতেন,
আর পড়তে হবে না,
আর সকালেও মোটে ১
ঘন্টা পড়, আর বাকি
সব মনে কর। এই
ব্যাপারটা এতটাই অভ্যাস হয়ে গেছিলো যে,
B.Sc/M.Sc তে উঠেও আগের রাতে
পরে পাস করা আমার
পক্ষে সম্ভব হয়নি, যে বিষয়গুলো সারাবছর
পড়িনি, তাতে সত্যিই খারাপ
ফল পেয়েছি । কারণ, পরীক্ষার
ঠিক আগের রাতে আমার
পড়তেই ইচ্ছে করতোনা । এমনকি এখনো আমার কোনো
Presentation থাকলে আমি অনেক আগে
থেকেই সেটা তৈরী করি,
কারণ বাবা আমাকে শিখিয়েছেন
পরীক্ষার আগের রাত শুধু
ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য।
অথচ
সেই বাবাই কিন্তু আমাকে সারা বছর অঙ্ক
করাতেন না, শুধু পরীক্ষার
দুদিন আগে মায়ের জোরাজুরিতে
বাপ-বেটিতে মিলে অঙ্ক কষতে
বসতাম, আর অঙ্ক করার
মধ্যে যে এত আনন্দ
সেটা অনুভব করতাম, আসলে হয়ত অনুভবও
করতাম না, কারণ কিছুই
বুঝতে পারতাম না, খিদে ঘুম
কিছুই পেত না, মা
ভাত বেড়ে, স্নান করতে যাবার জন্য
কত পিড়াপিড়ী করতেন, কিন্তু আমরা যেন সব
ভুলে অপরিসীম এক অঙ্কের
জগতে বিচরণ করতাম।
আমি
বাবার কাছ থেকে এই
একাগ্রতাটাই পেতে চাইতাম। আমার
বাবা পুরোদিন tv serials দেখে কাটাতে পারেন,
তেমনি প্রয়োজন পড়লে, চোখের সামনে পছন্দের ধারাবাহিক চললেও বাবা একাগ্রচিত্তে নিজের
কাজ করে যেতে পারেন,
তখন কোনো কিছুই তাকে
যেন স্পর্শ করেনা। আমার বাবা সংসারে
থেকেও সন্ন্যাসী, আবার সংসারের কিছু
কাজ এমন নিপুন ভাবে
করতে পারেন যে অনেক সুদক্ষ
গৃহিনীরাও লজ্জা পেয়ে যাবেন।
যেমন
খুব ছোট বাচ্চাকে সামলানো,
খাওয়ানো, স্নান করানো অদ্ভুত দক্ষতার সঙ্গে করেন। আমাদেরও সামলেছেন, সেতো আমার মনে
নেই, কিন্তু আমার দিদির যখন
মেয়ে হলো, তখন বাবা
নাতনিকে এত সুন্দর করে
স্নান করাতেন, সেটা এক দেখার
মত দৃশ্য ছিল।
একটু
বড় বাচ্চাদের অবশ্য বাবার সাথে তেমন জমেনা,
কারণ একটু বড় হলে
তারা গল্প করতে চায়,
আর বাবা তো রাজনীতি
ছাড়া কোনমতেই কোনো গল্প করবেন
না।
আর আমার বাবার এই
রাজনীতি বোধটাও বড় সাংঘাতিক। আমরা
অনেক ভাবে প্ররোচিত করার
চেষ্টা করছি, যাতে এই রাজনীতির
মধ্যে না থাকেন, কিন্তু
এই ক্ষেত্রে ওনাকে বিরত করা শিবের
ও অসাধ্য। এই সুবিধাবাদিত্বের যুগে,
নিজস্ব কোনো স্বার্থ ছাড়াই
শুধু মতাদর্শের কারণে উনি প্রায় একাই
ঝান্ডা নিয়ে ঘুরে বেড়ান,
তখন সত্যিই মনে হই, রবিঠাকুর
গানটা বোধহয় এমন লোকের কথা
ভেবেই লিখেছিলেন, যদি তোর ডাক
শুনে কেউ না আসে,
তবে একলা চল রে।
তবে
হ্যাঁ, সংসার জীবনে সবাইকে নিয়েই উনি চলেছেন। নানাজনের
নানা কথায় আমার রাগ
হলে উনি বলতেন সবাইকে
নিয়েই চলতে হয়, হয়ত
তখন ভাবতাম, বাবা সবাই কে
এত সহজে কেন ক্ষমা
করে দেন, আজ বুঝি
এই ক্ষমা করতে পারার ক্ষমতাটাই
শান্তিতে থাকার মূলমন্ত্র।
মেয়েরা
সাজগোজ করে মাকে দেখাতে
যায়, আর আমরা বাবাকে
দেখাতাম, আর মাও জানতেন
যে বাবা যতক্ষণ না
ভালো বলছেন, আমরাও সন্তুষ্ট হচ্ছিনা, তাই মাও সযত্নে
সেই জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাই
আজও আমার যেকোনো সিদ্ধান্তের
চূড়ান্ত শিলমোহরটা বাবার কাছ থেকেই পাই,
হয়ত অনেক সময় প্রভাবিত
করেই আদায় করি, কিন্তু
বাবার মুখ থেকে নিমরাজি
হ্যাঁ, না শোনা অবদি
শান্তি হয়না।
বাড়ির বড় মেয়ে হওয়ায় দিদিকে একটু মায়ের প্রত্যাশার চাপের মধ্যে যেতে হয়েছে, মা-ই তো আমাদের পড়াতেন। কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকতাম বলে আমাকে নিয়ে কেউ কিছু আশাটাশা করতনা, আমি
ঠিক মত খেয়ে পরে সুস্থ থাকলেই শান্তি পেত সবাই। তাও যদি মা একটু আধটু আমাকে নিয়েও ভেবে ফেলতেন, বাবা
মনে করিয়ে দিতেন, ও
যা পারে করবে, না
পাস করে করবে না, পরের
বছর করবে। আর আমার প্রতি বাবার এই ভরসা না রাখাটাই আমার সবচেয়ে ভরসার কারণ ছিল আর তাই আমি খুব মনের শান্তিতে থাকতাম। B.Sc 1st Yr এ আমার রেসাল্ট খুব খারাপ হয় (না
বখেটখে যায়নি, বাংলা
থেকে ইংরেজী মাধ্যমে গিয়ে খুব ঘাবড়ে গেছিলাম, আর
তাই পড়াশুনোটাই করে উঠতে পারিনি), অন্য
কোনো বাবা হলে কি বলত জানিনা, কিন্তু
আমার বাবা বলেছিলেন, ওহ
এত ভালো নম্বর, আমি
তো ভাবতেই পারিনি, তুমি
পাস করবে। আর সেটাই আমার অনুপ্রেরণা হয়ে যেত, বাবা
ভাবতেই পারেননি, আমি
পাস করব, অথচ
আমি পাস করে গেছি, তার
মানে আর একটু পড়লে আমি নিশ্চয় ভালো ফল করব। তবে বড় হয়ে বুঝেছি, বাবা
আসলে আমাকে না ভরসা করার মধ্যেই ভরসা করতেন।
আর তাই চেষ্টায়
আছি যেন সত্যিই ভরসাযোগ্য হয়ে উঠতে পারি। যতদিন বাড়ি ছিলাম, ততদিন বাবা ভাত বেড়ে খায়িয়েছেন,
জ্বর হলে রাত জেগে জলপটি দিয়েছেন, আরও অনেক কিছু। বাবা হিসাবে বাবার তুলনা বাবা নিজেই
। পিতৃদিবসে তার কাছ থেকে আশির্বাদ চাই, ভবিষ্যতে আমি যেন তাকে ততটাই যত্নে রাখতে পারি,
তার মত নিখুঁত না হলেও, তার কিছুটা যোগ্য সন্তান হতে পারি।
No comments:
Post a Comment