Monday, 12 September 2016

নারীবাদ?

আজ আনন্দবাজারে অমিতাভ বচ্চনের সাক্ষাৎকার পড়লাম। দুটো কথা বেশ মনে দাগ কেটেছে।
১. ঢোল, গওয়ার, শুদ্র, পশু, নারী, ইয়ে সব তাড়নকে অধিকারী। কী অসম্ভব বিদ্বেষমূলক একটা মন্তব্য। অথচ যুগ যুগ ধরে চলছে।
২. ‘পিঙ্ক’ রিলিজ হতে দিন। দেখবেন মহিলাদের ছোট করে পার্টিফার্টিতে হাসিমশকরা আর তাদের পিছনে লাগাটা বন্ধ হয়ে যাবে।

অত্যন্ত অশাদায়ক কথা। কিন্তু একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী। একবার বলা হলো যে নারীদের (এই লেখাতে শুধুমাত্র নারীদের নিয়েই বলছি, তাই বাকিগুলো উল্লেখ করলাম না) প্রতি বিদ্বেষ যুগ যুগ ধরে চলছে আর পরক্ষনেই বলা যে একটি সিনেমা পুরো পরিস্থিতি বদলে দেবে! ফিল্মী ডায়লগ হিসাবে মন্দ নয়, কিন্তু বাস্তবসম্মত কি?

অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি কি নারীবাদী, নারীদের নিয়ে আমার সচেতনতা তারা ঠিক বুঝতে পারেন না। কেউ কেউ অবশ্য চেষ্টা করেন, তাদেরকে ধন্যবাদ। এবার প্রশ্ন হলো আমি কি নারীবাদী? উত্তরটা জটিল নয় কিন্তু এক কথায় হ্যা বা নাও বলতে পারছিনা।
নারীস্বাধীনতা মানে যদি উচ্চবিত্ত ঘরের মেয়েদের সিগারেট মদ খাওয়ার অধিকার হয়, polygamy-র স্বাধীনতা হয়, তাহলে না, আমি মোটেই নারীবাদী নয়। প্রথমকথা, আমি ব্যক্তিগতভাবে সিগেরেট বা মদ্যপানের বিরোধী হলেও কারোর খাওয়া নিয়ে আমার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আমি এটাকে, 'ওরে বাবা, একি অনাছিষ্টি' ভাবিনা, তেমনি এর মধ্যে 'Hey Dude, be cool' মার্কা কোনো আহামরি ব্যাপারও দেখিনা। ছেলেরা যেটা করছে সেটা আমাকে করে ওদের মতোই হতে হবে, এর মধ্যে প্রতিযোগীতা থাকতে পারে, স্বাধীনতা আছে কি?
আর polygamy ছেলেদের জন্য biologically খুব স্বাভাবিক ঘটনা, মেয়েদের জন্য নয়।
কাজেই সেই 'Hey dude, I am cool' দেখানোর জন্য অনেকের শয্যাসঙ্গিনী হওয়ার মধ্যে সার্থকতা নেই। এবার কারো যদি সেটা ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার হয়, কারো দ্বারা প্রভাবিত না হয়েই, শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছে হয়, সে ক্ষেত্রে, আমার কোনো বক্তব্য নেই।
প্রসঙ্গত উলেখ্য, শারীরিক সুস্বাস্থ্যের জন্য নারী পুরুষ নির্বিশেষে monogamy তে বিশ্বাসী হওয়ায় শ্রেয়।

এবার উক্ত ঘটনা বাদে নারীর অধিকার সংক্রান্ত দাবিদাওয়া, যেমন একটা মেয়েকে জন্মাতে দেয়ার অধিকার, একটা মেয়েকে স্কুলে পড়তে দেয়ার অধিকার, একটা মেয়েকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দেয়ার অধিকারের জন্য গলা ফাটালে সেটা যদি নারীবাদ হয়, তাহলে আমি ভীষণ ভাবে নারীবাদী। আর যে দেশে, প্রতিদিন লাখ লাখ মেয়ে জন্মানোর আগেই মরে যায়, যে দেশে প্রতিনিয়ত ধর্ষিতারা ওড়নায় মুখ লুকায় আর ধর্ষক বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, সে দেশের শুধু মেয়েরা নয়, যে কোনো সংবেদনশীল মানুষেরই নারীবাদী হওয়া উচিত।
এই নারীবাদী শব্দটার মানে কিন্তু চশমা পরে হাতে ঝান্ডা নিয়ে প্রতিবাদসভায় বসা নয়, হ্যা সেটাও দরকার কোনো কোনো চরম পরিস্থিতিতে, কিন্তু প্রথমত নারীবাদ মানে আমি বুঝি একটা অনুভূতি, প্রতিমুহূর্তে দেশে দেশে যত মেয়েরা লাঞ্ছিত হচ্ছে, তাদের জন্য কিছু, ভালো কিছু করার ইচ্ছেটা হলো নারীবাদ। অসহায় মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোটা হলো নারীবাদ, এমনকি কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে জীবনে চলার পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেন, তাহলে আজকের এই সামাজিক পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে, সেটাও নারীবাদ। একজন মানুষ আর একজনকে সাহায্য করলে সেটা মানবতা হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু বৃহত্তর সমাজ মেয়েদেরকে তো মানুষ হিসাবেই মনে করে না। কাজেই একজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষ যদি নারীকে যোগ্য মনে করেন, তাহলে তাকে নারীবাদীই বলতে হয়।
মেয়েরা শারীরিক সক্ষমতায় পুরুষদের সমান হতে পারবে না (খেলোয়াড়দের কথা আলাদা), আবার মেয়েরা যে কাজ করতে পারবে সেটা ছেলেদের পক্ষেও করা সম্ভব নয়। তাই নারীকে সর্বক্ষেত্রেই পুরুষের সমান হতে হবে এই ভাবনা বোধহয় সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, যেটা করবে সেটা একটা প্রতিযোগিতা হবে, সেটা একটা ক্ষোভের জন্ম দেবে। বরং যদি ভাবা যায়, দুজন দু রকমের মানুষ, কেউ কারো মতো হতেও পারবে না, হওয়ার চেষ্টাও করতে হবে না, বরং দুই পক্ষই একে অপরকে বুঝুক, একে ওপরকে সম্মান করুক, তাহলে বোধহয় এই বিভাজনটা কিছুটা মিটতে পারে।
'আরে তুই মেয়ে, তুই তোর দাদার মতো থোড়ি না হতে পারবি?' এই কথাটা বলার কি দরকার? এই কথাটাতো দাদার প্রতি হিংসার জন্ম দেবে, নিজে মেয়ে হওয়ার জন্য হতাশা জন্ম দেবে, পরে সে যখন মা হবে, তখন সে নিজের মেয়ের মধ্যেও এই হতাশাকে সঞ্চারিত  করবে। তার থেকে যদি বলা যেত, 'তুমি তোমার মতো, তুমি যেটা পারো সেটা করো, দাদার সাথে তুলনারই দরকার নেই', তাহলে মেয়েটা বোধহয় মেয়ে হওয়ার জন্য দুঃখ পেতোনা।

আমি জানি আমার এই সব কথায় কিছুই পরিবর্তন হবে না, যুগ যুগ ধরে যে বৈষম্য রক্তে মিশে গেছে, যে বিদ্বেষ মিশে গেছে, একটা লেখা বা একটা সিনেমা সেই বিদ্বেষ সেই বৈষম্য কিছুই মেটাতে পারবে না। কিন্তু বড্ডো অসহায় লাগে যখন প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই দেখি, অ্যাসিড আক্রমণে একটা ফুটফুটে মেয়ে সৌন্দর্যের সাথে সাথে মনোবল হারিয়েছে, নবজাতিকাকে কুকুরে ছিঁড়ে খেয়েছে, কন্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনা শহরাঞ্চলে বেড়ে গেছে আর তার অবসম্ভাবী ফলস্বরূপ কন্যাপাচার। (মেয়ে আমি চাই না চাই, বৌ (read, যৌনকর্মী ) ছাড়া কি চলে? )

তবুও ভাবতে ভালো লাগে, অমিতাভ বচ্চনের ফিল্মি ডায়ালগ বিশ্বাস করতে খুব ইচ্ছে করে, 'পিঙ্ক' মুক্তি পেলেই পরিস্থিতি পাল্টে যাবে।
কিছুই পারিনা করতে, তবুও যদি একজনকেও নারীবাদী বানাতে পারে আমার এই লেখা তবেই আমার সার্থকতা, নারীবাদী হিসাবে। 

বিঃ দ্রঃ ঢোল, গওয়ার, শুদ্র, পশু নিয়ে অন্য একদিন আলোচনা করবো ।

No comments:

Post a Comment

পড়া এবং পড়ানোর পাঁচকাহন।

  ছাত্র ছাত্রীদের "Electrostatics & Magnetostatics" পড়ানোর জন্য এই বইগুলো নিয়ে বসেছিলাম। একেই বলে জাহির করা। 🤭 "দেখো M...